বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) ভুয়া ইমারত নকশা ও ব্যাংক চালান জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের এক নজিরবিহীন দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে। নিয়ম-নীতি ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিলেট নগরীর প্রায় ৩০০টি ভবনের জাল নকশা অনুমোদন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিসিকের অসাধু একটি সিন্ডিকেট। জালিয়াতির এই মহাপরিকল্পনার সাথে সরাসরি জড়িত সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমেদ তানভির, সহকারী প্রকৌশলী মোছা: রওশন আরা সিদ্দিকা (নুপুর) এবং ড্রিলিং অ্যাসিস্টেন্ট জাহিদ আল ফাহিম। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো- দুর্নীতি প্রমাণের পরও তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ মার্চ ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও, দীর্ঘ প্রায় ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি।
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ৩০০টি ইমারতের ভুয়া নকশা জালিয়াতি সংক্রান্ত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণসহ ৫৭ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন অনেক আগেই প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু অজানা কারণে কিংবা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে রক্ষায় তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেননি। বছরের পর বছর ধরে ডেস্কেই পড়ে রয়েছে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অপকর্মের খতিয়ান। এ বিষয়ে সিলেটের স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিনিয়ত অনুসন্ধান চালালেও সিসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়টি বরাবরের মতোই এড়িয়ে যাচ্ছেন।
নজিরবিহীন এই রাজস্ব আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সিসিক কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমেদ তানভির, সহকারী প্রকৌশলী মোছা: রওশন আরা সিদ্দিকা (নুপুর) এবং ড্রিলিং অ্যাসিস্টেন্ট জাহিদ আল ফাহিমকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বহিষ্কার ও পরবর্তীতে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। এত বড় ফৌজদারি অপরাধ ও সরকারি রাজস্ব লুটের পরও তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় না এনে স্রেফ প্রশাসনিক চিঠির মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যায়, ঘটনার মূল হোতা ড্রিলিং অ্যাসিস্টেন্ট জাহিদ আল ফাহিম ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে গা-ঢাকা দিয়ে পলাতক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ফাহিম সিসিকের প্রধান প্রকৌশলীর অফিস সহকারী জুনেল আহমদের ভাগ্নে। মামা জুনেল আহমদের প্রভাবেই তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজকে ম্যানেজ করে ২০১৯ সালে সিসিকে কার্যসহকারী পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি নেয় ফাহিম। পরবর্তীতে পূর্ত শাখায় দায়িত্ব পালনকালীন সে সেবাগ্রহীতাদের ভবন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে এবং ভুয়া ব্যাংক চালান ও টিউবওয়েলের জাল রসিদ তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। কেবল নিজেই নয়, সহকারী প্রোগ্রামার মনসাজ নাসিফও ফাহিমকে দিয়ে ইমারত নকশার অন্তত ৩টি ফাইল বেআইনিভাবে অনুমোদন করিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
সিসিকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে এই দুর্নীতিবাজ চক্রটি জলাশয়, ডোবা, টিলা ও পুকুর শ্রেণীর জমিতেও অবৈধভাবে ইমারত নির্মাণের ফাইল অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে সিলেট নগরীর প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এবং সিসিক হারিয়েছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫৭ পৃষ্ঠার এই বিস্ফোরক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে সিসিকের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ দুর্নীতি ও যোগসাজশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ফৌজদারি মামলা এবং কোটি কোটি টাকার জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। আর সে কারণেই এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় রিপোর্টটি ফাইলবন্দী করে রাখা হয়েছে। সিসিকের সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই ৫৭ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ, জড়িত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত রাজস্ব পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply